Home / জাতীয় / দেশবরেণ্য সাংবাদিক মিজানুর রহমান খান আর নেই, জানাজা–দাফন মঙ্গলবার

দেশবরেণ্য সাংবাদিক মিজানুর রহমান খান আর নেই, জানাজা–দাফন মঙ্গলবার

ঢাকাঃ দেশের শীর্ষ স্থানীয় দৈনিক প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক মিজানুর রহমান খান আর নেই (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাহি রাজেউন)।সোমবার (১১ জানুয়ারি ২০২১) সন্ধ্যায় ৬টা ২০ মিনিটে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৫৩ বছর। মিজানুর রহমান খান আজ সোমবার সন্ধ্যায় রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেন। মিজানুর রহমান খান মা, স্ত্রী, তিন সন্তান, পাঁচ ভাই, তিন বোনসহ অসংখ্য আত্মীয়স্বজন ও গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।

সাংবাদিক মিজানুর রহমান খান
খবরের খোঁজে ছোটার ইতি টানলেন সাংবাদিক মিজানুর রহমান খান

খবরের খোঁজে ছোটার ইতি টানলেন মিজানুর রহমান খান। সম্পাদকের ভাষায় ‘আউলা-ঝাউলা, কিন্তু জাত সাংবাদিক’ মিজানকে করোনা কেড়ে নিয়েছে।

কোনো প্রস্তুতি ছাড়াই মিজানের বহু প্রতিবেদন এভাবেই ছাপা হয়েছে। ‘আউলা-ঝাউলা’ মিজান বিদায় নিলেন পরিবার এবং প্রথম আলোর সবাইকে অপ্রস্তুত রেখেই। অপ্রস্তুত বলছি এ কারণে যে তাঁর বয়স তো হয়েছিল মাত্র ৫৩।

করোনাকালেও তাঁর সঙ্গে নানা সময়ে টেলিফোনে কথা হয়েছে। প্রতিবারই তাঁকে মনে করিয়ে দিয়েছি, করোনার সংক্রমণ থেকে সাবধান থাকুন। কিন্তু সাংবাদিকতার নেশা তাঁকে সংক্রমণ থেকে রেহাই দেয়নি। চিকিৎসাধীন করোনায় আক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বের সাক্ষাৎকার নিতে তিনি নিজেই হাসপাতালে চলে গেছেন। প্রথম প্রথম কিছুদিন জনসমাগম এড়ানোর চেষ্টা করলেও পরে জনাকীর্ণ বিভিন্ন অনুষ্ঠানেও গেছেন খবরের খোঁজে। সম্পাদকীয় বিভাগে কাজ করেন বলে শুধু সম্পাদকীয় আর উপসম্পাদকীয় লেখায় তিনি নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি।

সাংবাদিক ও প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক মিজানুর রহমান খানকে কাল মঙ্গলবার রাজধানীর মিরপুরে শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে দাফন করা হবে। তার আগে জানাজা অনুষ্ঠিত হবে।

পারিবারিক সূত্র ও প্রথম আলো কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আজ রাতে তাঁর মরদেহ বারডেমের হিমঘরে রাখা হবে। এরপর আগামীকাল সকাল ১০টায় প্রথমে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি প্রাঙ্গণে, এরপর সাড়ে ১০টায় রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে এবং বেলা ১১টায় জাতীয় প্রেসক্লাব প্রাঙ্গণে আরেক দফা জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। সেখান থেকে দুপুর ১২টায় তাঁর মরদেহ কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো কার্যালয়ের সামনে আনা হবে শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য। পরে বাদ জোহর তাঁকে দাফন করা হবে।

বিশিষ্ট এই সাংবাদিকের মৃত্যুতে গভীর শোক জানিয়েছেন দেশের বিভিন্ন শ্রেণি–পেশার মানুষ, সংগঠন ও দল। অসংখ্য মানুষ সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমেও শোক জানিয়েছেন। শোক বার্তায় বিশিষ্টজনেরা বলেছেন, আইন বিষয়ে লেখালেখি ও সাংবাদিকতায় মিজানুর রহমান খান ছিলেন পথিকৃৎ। তাঁর মৃত্যু অপূরণীয় ক্ষতি। তিনি ছিলেন একজন নীতিমান সাংবাদিক।

তথ্যমন্ত্রী হাছান মাহমুদ এক শোক বার্তায় বলেন, বর্ণাঢ্য কর্মজীবনে সাংবাদিকতার পাশাপাশি মেধাবী মিজানুর রহমান খানের রচিত গ্রন্থগুলো মানুষকে সংবিধান ও সরকার সম্পর্কে জানতে আগ্রহী করেছে। তিনি তাঁর সাবলীল, বিশ্লেষণী লেখনী ও কথনের মাঝে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর শোক বার্তায় বলেছেন, একজন নীতিমান সাংবাদিক হিসেবে মিজানুর রহমান খানের লেখনী ছিল সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে। সাংবাদিকতা জগতে তাঁর অবদান নিঃসন্দেহে অনস্বীকার্য।

বিশিষ্ট এই সাংবাদিকের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক, সাবেক প্রধান বিচারপতি ও আইন কমিশনের চেয়ারম্যান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস, পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুক, উপমন্ত্রী এ কে এম এনামুল হক, জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদের, জাসদের সভাপতি হাসানুল হক ইনু ও সাধারণ সম্পাদক শিরীন আখতার, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মো. আখতারুজ্জামান, অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন, বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান খন্দকার মাহবুব হোসেন, সাবেক আইনমন্ত্রী আবদুল মতিন খসরু, দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ, ভারতীয় হাইকমিশনার বিক্রম দোরাইস্বামী, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রওনক জাহান, সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা জাফরুল্লাহ চৌধুরী, বিশিষ্ট আইনজীবী এম আমীর–উল ইসলাম, শাহদীন মালিক, মানবাধিকারকর্মী হামিদা হোসেন, কলামিস্ট আবদুল গাফফার চৌধুরী, সৈয়দ আবুল মকসুদ, টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান, বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল আউয়াল মিন্টু, নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না, বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সদস্য অধ্যাপক মুহাম্মদ আলমগীর, জাতীয় প্রেসক্লাবের সভাপতি ফরিদা ইয়াসমিন ও সাধারণ সম্পাদক ইলিয়াস খান, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি কুদ্দুস আফ্রাদ ও সাধারণ সম্পাদক সাজ্জাদ আলম খান, বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি ফজলুল হক, এডিটরস গিল্ড, বাংলাদেশ; ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি, ডিপ্লোমেটিক করেসপনডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন, ঐক্য ন্যাপ, সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলন, বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম, ক্যাপিটাল মার্কেট জার্নালিস্ট ফোরাম, মানবাধিকার সংগঠন ব্লাস্ট। বাংলাদেশ অনলাইন মিডিয়া অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এডভোকেট মো. জাহাঙ্গীর আলম ও সাধারণ সম্পাদক নাসিমা খান মন্টী।

মিজানুর রহমান খান করোনাভাইরাসে সংক্রমিত হয়েছিলেন। করোনার নমুনা পরীক্ষায় গত ২ ডিসেম্বর পজিটিভ রিপোর্ট আসে। প্রথমে গত ৫ ডিসেম্বর তিনি গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতালে ভর্তি হন। তাঁর শারীরিক সমস্যা বাড়লে সেখান থেকে গত ১০ ডিসেম্বর তাঁকে মহাখালীর ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে তাঁকে নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হয়। শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে গত শনিবার বিকেলে তাঁকে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়। আজ সন্ধ্যা ৬টা ৫ মিনিটে তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন দায়িত্বরত চিকিৎসক।

ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক জাহিদ আহমেদ সিদ্দিকী প্রথম আলোকে বলেন, সাংবাদিক মিজানুর রহমান খান গত ১০ ডিসেম্বর এই হাসপাতালে ভর্তি হন। তাঁকে কোভিড-১৯ জোনে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হয়। এরপর ১৫ ও ১৬ ডিসেম্বর আবার করোনার নমুনা পরীক্ষা করা হলে নেগেটিভ রিপোর্ট আসে।

পরে তাঁকে সবুজ জোনে নিয়ে চিকিৎসা দেওয়া হয়। এত দিন তাঁকে অক্সিজেন দিতে হয়েছে। তিনি অক্সিজেন সাপোর্টে ছিলেন। ৯ জানুয়ারি তাঁর অক্সিজেনের চাহিদা বাড়তে থাকে। ওই দিন বিকেল পৌনে পাঁচটায় তাঁকে ভেন্টিলেশন সাপোর্ট (কৃত্রিমভাবে শ্বাসপ্রশ্বাস) দেওয়া হয়। তাঁর রক্তচাপও কমে যায়। এর মধ্যেই আজ বিকেল সোয়া পাঁচটায় হার্ট অ্যাটাক হয়। পরে সন্ধ্যা ৬টা ৫ মিনিটে তাঁকে মৃত ঘোষণা করা হয়।

মিজানুর রহমান খানের মৃত্যুর খবর পেয়ে হাসপাতালে ছুটে যান বিভিন্ন গণমাধ্যমের কর্মীরা। এ সময় প্রথম আলোর ব্যবস্থাপনা সম্পাদক সাজ্জাদ শরিফ সাংবাদিকদের বলেন, আপাদমস্তক একজন সাংবাদিক ছিলেন মিজানুর রহমান। সারাক্ষণ সংবাদ সংগ্রহের কাজে লেগে থাকতেন। আইন বিষয়ে তিনি খুবই প্রাজ্ঞ ছিলেন। তিনি নিজেকে এমন উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন যে আইনের অনেক পেশাজীবীও কোনো বিষয়ে সমস্যায় পড়লে সমাধানের জন্য মিজানুর রহমান খানের সঙ্গে আলোচনা করতেন। তাঁর মৃত্যু সাংবাদিকতা ও দেশের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি।

জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক মিজানুর রহমান খানের মৃত্যুতে প্রথম আলো পরিবার গভীর শোক প্রকাশ করেছে এবং তাঁর বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করছে। একই সঙ্গে তাঁর শোকাহত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছে।

সাংবাদিক মিজানুর রহমান খান ১৯৬৭ সালের ৩১ অক্টোবর ঝালকাঠির নলছিটিতে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি বরিশালের ব্রজমোহন (বিএম) কলেজ থেকে হিসাববিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেন ১৯৮৮ সালে। দীর্ঘদিন ধরে সাংবাদিকতায় থাকা মিজানুর রহমান খান ১৯৯৯ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত যুগান্তর–এর বিশেষ সংবাদদাতা ও সহকারী সম্পাদক ছিলেন। এরপর সমকাল–এর উপসম্পাদক হিসেবে যোগ দেন। প্রথম আলোয় যোগ দেন ২০০৫ সালের ১ নভেম্বর।

সাংবাদিকতার পাশাপাশি বাংলাদেশের সংবিধান সংস্কারের সপক্ষে জনমত গঠনে তিনি ভূমিকা পালন করেন। তিনি বইও লিখেছেন। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘সংবিধান ও তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিতর্ক’ (১৯৯৫), ‘বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকটের স্বরূপ’ (২০০৩), ‘১৯৭১ আমেরিকার গোপন দলিল, মার্কিন দলিলে মুজিব হত্যাকাণ্ড’।

তাঁর দুই ছোট ভাইও সাংবাদিক। এর মধ্যে সিদ্দিকুর রহমান খান একটি অনলাইন পত্রিকার সম্পাদক ও আরেক ভাই মসিউর রহমান খান ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাধারণ সম্পাদক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*