Home / রাজনীতি / জাকারিয়া চৌধুরী ও তাঁর আন্দোলন সংগ্রামের সেই দিনগুলি

জাকারিয়া চৌধুরী ও তাঁর আন্দোলন সংগ্রামের সেই দিনগুলি

ঢাকাঃ আমার দীর্ঘ জীবনের চলার পথে পথে যেতে যেতে বহু আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত ছিলাম। স্কুলে থাকতে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে প্রথম রাস্তায় নামি এবং মিছিল করে মহকুমা প্রশাসকের অফিসে গিয়ে দালানে উঠে কংগ্রেস, মুসলিম লীগ ও কমিউনিস্ট পার্টির পতাকা উত্তোলন করি ‘রশীদ দিবস’ পালন করার ইস্যুতে। কর্নেল রশীদ ছিলেন নেতাজি সুভাষ বসুর গড়া আজাদ হিন্দ ফোর্স খ্যাত Indian National Armyর শীর্ষ পর্যায়ের এক কমান্ডার। ভারতকে স্বাধীন করার ব্রত নিয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানের সহায়তায় তারা ব্রিটিশের বিরুদ্ধে বার্মা ফ্রন্টযুদ্ধে অবতীর্ণ হন। কর্নেল রশীদ, কর্নেল শাহ্নেওয়াজ ও আরও অনেকে ব্রিটিশ পরিচালিত ইন্ডিয়ান আর্মিতে থাকাকালে স্বপক্ষ ত্যাগ করে বিপ্লবী জাতীয়তাবাদী নেতা সুভাষ বসুর নেতৃত্বাধীন Indian National Army তে যোগ দেন। তারা ছিলেন আমার বরেণ্য ব্যক্তি। নেতাজি সুভাষ বসু ছিলেন আমার কিশোর মনের হিরো। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ শেষে ১৯৪৬ সালে ব্রিটিশশাসিত ভারতীয় সরকার কর্নেল রশীদকে স্বপক্ষ ত্যাগ ও বিদ্রোহের অভিযোগে মৃত্যুদন্ড দেওয়ার পাঁয়তারা করায় এর প্রতিবাদে অবিভক্ত ভারতের তখনকার তিন বড় রাজনৈতিক দল কংগ্রেস, মুসলিম লীগ ও কমিউনিস্ট পার্টি এক হয়ে এ দিবসটি পালন করে। ‘খারাপ অদৃষ্ট!’ আমার বাবা ছিলেন তখন আসামের করিমগঞ্জ মহকুমার প্রশাসক, যার অফিসে আমরা বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে যাই। রাতে এ কারণে আমাকে বাবার মুখোমুখি হতে হয়। বাবা আমাকে দেখেই গর্জে উঠে বললেন, ‘তুমি কি আমার চাকরি খেতে চাও? আমার চাকরি গেলে তোমাদের কে খাওয়াবে-পরাবে?’ শুধু কথা বলেই ক্ষান্ত হননি তার কিছু উত্তমমধ্যমও আমাকে সইতে হয়। যেহেতু আমি অপ্রাপ্ত বয়সের স্কুলে পড়া কিশোর তাই আমার কার্যকলাপের জন্য স্বভাবতই তিনি দায়ী। এজন্য তাকে সরকারের কাছে পরে কৈফিয়ত দিতে হয়।

May be an image of 5 people, including Kabir Journalist and Soumitra Dev, people standing and people sitting

ঔপনিবেশিক ব্রিটিশশাসিত অবিভক্ত ভারত ভেঙে স্বাধীন ভারত ও পাকিস্তান সৃষ্টি হয়েছে ১৯৪৭ সালে। পরাধীনতার শিকল ছিন্ন করে আমিও তখন ব্রিটিশ-ইন্ডিয়ান নাগরিকত্ব থেকে রূপান্তরিত হলাম স্বাধীন পাকিস্তানি নাগরিকে।

১৯৫২ সাল। আমি তখন পূর্ব পাকিস্তানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি (সম্মান)-এর প্রথম বর্ষের ছাত্র। ভাষা আন্দোলনের ঢেউয়ে আমি অনুপ্রাণিত হয়ে আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ি। এটা কোনো দলীয় রাজনৈতিক আন্দোলন ছিল না। ছিল ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষায় জেগে ওঠা স্বতঃস্ফূর্ত ছাত্র বিস্ফোরণ। তবে আওয়ামী মুসলিম লীগ ও কমিউনিস্ট পার্টির সমর্থন ও সহযোগিতা ছিল। ভাষা ও সংস্কৃতি হারানো মানে আবারও গোলাম হয়ে থাকা। আওয়ামী মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন শামসুল হক, যিনি প্রাদেশিক আইন পরিষদের উপনির্বাচনে মুসলিম লীগ প্রার্থী পন্নীকে হারিয়ে নবনির্বাচিত সদস্য হন। বঙ্গবন্ধু তখন কারাগারে। তিনি ছিলেন দলের যুগ্মসাধারণ সম্পাদক। কারাবস্থায় থাকলেও তিনি আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। ’৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির মিছিলে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে গ্রেফতার হয়ে জেল খাটি বেশ কিছুদিন। থানায় কিংবা জেলে কোথাও পুলিশ বা জেল কর্তৃপক্ষ আমাদের সঙ্গে কোনোরূপ দুর্ব্যবহার করেনি। বরং তারা আমাদের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিল। কিছুদিন পর সরকার আমাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ রহিত করে মুক্তি দেয়।
Bangladesh Pratidinলন্ডন। অক্টোবর, ১৯৫৮ সাল। আমি ব্যারিস্টার হওয়ার জন্য আইন অধ্যয়নরত, লিঙ্কনস্ ইনের ছাত্র। পাকিস্তানে গণতান্ত্রিক সরকার উৎখাত করে আবির্ভূত হলো সামরিক শাসন। সামরিক শাসনকর্তা হলেন জেনারেল আইয়ুব খান। বই-পুস্তক ছেড়ে নেমে পড়লাম আইয়ুববিরোধী আন্দোলনে। তছদ্দোক আহমদ ও হামজা আলভী সংগঠিত Committee for the Restoration of Democracy in Pakistan -এর আমি ছিলাম যুগ্ম-আহ্বায়ক। মিটিং, মিছিল, স্মারকলিপি ইত্যাদি কাজে তখন ব্যস্ত হয়ে পড়ি। ১৯৬০ সালে সশস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে স্বাধীন সমাজতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ব বলে ‘পূর্বসূরি’ নামে গোপন সংগঠন করি। আমি ছিলাম তার আহ্বায়ক। আর গেরিলা যুদ্ধ করার জন্য সংগঠন করি East Bengal Liberation Front যার দায়িত্বে ছিলেন আলমগীর কবীর যিনি পরে সাংবাদিক ও চিত্রপরিচালক রূপে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। দুঃখের বিষয়, তিনি মারা যান সড়ক দুর্ঘটনায়। ‘পূর্বসূরি’র কার্যক্রম পরিচালনার জন্য চাঁদা তুলে লন্ডনের আর্সিনেলে একটি বাড়ি কিনে নাম দিই East Pakistan House। এ বাড়ির অন্যতম ট্রাস্টি ও প্রেসিডেন্ট ছিলেন মিনহাজ উদ্দীন। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর বাড়িটি হস্তান্তর করে দেওয়া হয় বাংলাদেশ সরকারকে।

১৯৬৩ সাল। বঙ্গবন্ধু লন্ডনে এলেন আওয়ামী লীগ প্রেসিডেন্ট হোসেন শহীদ সোহ্রাওয়ার্দীর সঙ্গে শলাপরামর্শের জন্য। বঙ্গবন্ধু কেন জানি না তার সঙ্গে আমাকে দেখা করার জন্য আগাম বার্তা পাঠিয়েছিলেন Green Masque Restaurent -এর মালিক আবদুল মান্নান (ছানু মিয়া) মারফত। আমি বঙ্গবন্ধুকে তখন জানি একজন গণতন্ত্রকামী ও ত্যাগী নেতা এবং পাকিস্তান আন্দোলনের একজন সংগ্রামী ছাত্রনেতা হিসেবে। তিনি ছিলেন মুসলিম লীগ নেতা ও অবিভক্ত বাংলার মুখ্যমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর এক নম্বর আস্থাভাজন কর্মী। যদিও এর আগে কখনো তার সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ-পরিচয় হয়নি। তাই তার সঙ্গে যখন সাক্ষাতে যাই Green Masque Restaurent -এ তখন আলাপ-আলোচনার একপর্যায়ে ভয়ে ভয়ে বলি, ‘আপনি তো পাকিস্তান নিয়ে রাজনীতি করেন। আমরা কিন্তু পাকিস্তানে আর বিশ্বাস করি না। আমরা স্বাধীন বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে সংগঠন করেছি।’ আমি আশ্চর্য হলাম তিনি তক্ষুনি কোনো দ্বিধাদ্বন্দ্ব না রেখে বললেন, ‘আমারও সেই লক্ষ্য। আপনারা আপনাদের মতো করে প্রস্তুতি নেন, আমি আমার মতো করে নেব।’ এ লক্ষ্যেই ’৬৬ সালে বঙ্গবন্ধু ছয় দফার স্বাধিকার দাবি উত্থাপন করে পাকিস্তানের ভিত নড়িয়ে দিলেন। আমাদের পরিকল্পনা ছিল গেরিলা যুদ্ধ করে পাকিস্তানি শাসন হটিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশ গড়া আর বঙ্গবন্ধুর কথা হলো আগে স্বাধীনতার পক্ষে জনমত সৃষ্টি করে পরে যুদ্ধ। তার মধ্যে ছিল সুচিন্তিত দূরদর্শী স্ট্র্যাটেজি, আর আমাদের মধ্যে ছিল তারুণ্য-তাড়িত অ্যাডভেঞ্চারিস্ট ভাবাবেগ। দেশ স্বাধীন হয়েছে বঙ্গবন্ধুর পথ ধরেই। সেই সাক্ষাতের সময় থেকে স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে আমার নিবিড় রাজনৈতিক ও সামাজিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এ সম্পর্কে কিছুটা অবগত আছেন বঙ্গবন্ধুকন্যা সফলতায় সমুজ্জ্বল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ১৯৬৯ সালে বঙ্গবন্ধুর মুক্তির দাবিতে যে ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থান হয় তার ফলে মুক্তিপ্রাপ্ত হয়ে বঙ্গবন্ধু যখন লন্ডনে আসেন তখন সেখানে শেখ হাসিনা ও ড. ওয়াজেদ মিয়া তার সঙ্গে মিলিত হওয়ার জন্য ইউরোপ থেকে (খুব সম্ভবত ইতালি থেকে) এসেছিলেন। যে কদিন বঙ্গবন্ধু হোটেলে ছিলেন তখন শেখ হাসিনার উপস্থিতিতেই দেশ স্বাধীন করার ব্যাপারে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আমার অনেক আলাপ-আলোচনা হয়। এক বঙ্গবন্ধু ছাড়া তখন স্বাধীনতার ধ্যান-ধারণা, চিন্তা-চেতনা এবং রাজনৈতিক কার্যক্রম আর কোনো নেতা বা দলের মধ্যে ছিল না। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে আমি লন্ডনে এবং বার্মিংহামে জনসভা করি। বঙ্গবন্ধু আমাকে লন্ডনে আওয়ামী লীগ গঠন করে আওয়ামী লীগের প্রেসিডেন্ট হিসেবে থাকার প্রস্তাব দেন। আমি বিনয়ের সঙ্গে দলভুক্ত হওয়ার ব্যাপারে আমার অপারগতা জানাই। বলি, ‘আমি আপনার অনুষঙ্গী ও অনুরাগী হয়ে থাকব কিন্তু দলভুক্ত হতে চাই না।’ তখন তিনি আমাকে লন্ডনে আওয়ামী লীগ গঠন করে দেওয়ার জন্য অনুরোধ করেন। আমি গউছ খানকে প্রেসিডেন্ট ও তৈয়বুর রহমানকে সাধারণ সম্পাদক করে এই প্রথম প্রবাসে আওয়ামী লীগের সংগঠন গড়ে তুলি। আমি দলীয় শৃঙ্খলে পড়ে ব্যক্তিস্বাধীনতা ও স্বাধীন মতামত প্রকাশের পথ রুদ্ধ করতে চাইনি। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান তার সরকারে এবং দলে যোগদানের জন্য প্রস্তাব দিলে আমি তখনো রাজি হইনি। বার বার তার (প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান) চাপাচাপিতে একপর্যায়ে যখন তিনি আমাকে বলেন, ‘আপনি সেই ব্যক্তি, যে ধরি মাছ না ছুঁই পানি। কোনো দায়িত্ব নিতে চান না।’ এ কথায় আমার মনে জেদ জাগে। অগত্যা সরকারে যোগ দিলেও মতবিরোধের কারণে বেশিদিন টিকে থাকা সম্ভব হয়নি। এরশাদ ক্ষমতায় আসার কিছুদিনের মধ্যে আমাকে Administrative Reform Committeeতে যোগ দিতে বললে আমি যোগ দিইনি। এক কথায় ক্ষমতার প্রতি আমার কোনো আকর্ষণ ছিল না। তবে চেয়েছি রাজনীতিতে থেকে দেশের সেবা করতে। যখনই কেউ ক্ষমতায় গিয়ে আমার পরামর্শ চেয়েছেন আমি তখন খুশিমনে দিয়েছি।

১৯৬৮ সাল। যখন খবর পেলাম বঙ্গবন্ধুকে স্পেশাল ট্রাইব্যুনালে বিচার করার জন্য রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে কারারুদ্ধ করা হয়েছে তখন আমার বার ফাইনাল পরীক্ষা সন্নিকট। বার পরীক্ষার জন্য যে কোচিং করছিলাম তা পরিত্যাগ করে নেমে পড়লাম আন্দোলনে। প্রথমেই Amnesty Intenational -এর সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করে তাদের সহযোগিতা ও সমর্থন নিশ্চিত করি। প্রবাসীদের চাঁদার টাকায় বিলেতের প্রখ্যাত ব্যারিস্টার ও এমপি Sir Thomas Williams Q C কে বঙ্গবন্ধুর হয়ে আইনি লড়াইয়ের জন্য ঢাকায় পাঠানোর বন্দোবস্ত করি। ঢাকায় এলে তাকে সহযোগিতা করেন ব্যারিস্টার ড. কামাল হোসেন ও ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ। হাইড পার্ক (Hyde Park) মাঠে জনসভা করতে গিয়ে পাকিস্তান হাইকমিশন কর্তৃক লেলিয়ে দেওয়া গুণ্ডা কর্তৃক আক্রান্ত হই। জনসভা শেষে মিটিংয়ের ব্যানার জমা রাখার জন্য যখন Pakistan Student Federation-এর অফিসে যাই তখন আবারও লেলিয়ে দেওয়া গু-ার দল আমাকে কিল-ঘুষি মেরে জামাকাপড় ছিঁড়ে অপদস্থ করে। ওই অবস্থায় পুলিশ এসে আমাকে তাদের হাত থেকে রক্ষা করে।

আন্দোলনের একপর্যায়ে আমরা বেশ কিছুসংখ্যক ছাত্র ও শ্রমিক এক রাতে পাকিস্তান হাইকমিশনের দরজার সিকিউরিটি লক ভেঙে হাইকমিশন দখল করে নিয়ে বিক্ষোভ করি। আমাদের দাবি ছিল গণতন্ত্র ও বঙ্গবন্ধুর মুক্তি। কিছুক্ষণের মধ্যেই একদল পুলিশ এসে হাজির। তারা অর্ডার করল বেরিয়ে যেতে, তা না হলে বলপূর্বক আমাদের বের করে দেবে। আমি তাদের অফিসারকে অনুরোধ করলাম আমার সঙ্গে একটু একান্তে কথা বলার জন্য। আমার অনুরোধ রক্ষা করে সে অন্য এক কামরায় গিয়ে জানতে চাইল কী কথা। আমি বললাম, Officer, I am grateful to you for listening to us. We are demanding for democracy and release of our leader from imprisonment in a peaceful manner. We want to carry out your order peacefully. But if we walkout the impact of our protest will weaken. Instead if you kindly lift us up from lying down position that will be more impacting. After all we have learnt about democracy from your country . অফিসার আমার কথায় মৃদু হেসে রাজি হয়ে গেলেন। সংগ্রাম করতে গেলেও একটু কৌশলী হতে হয়, গায়ের জোরে সবকিছু হয় না। ততক্ষণে পাকিস্তানের হাইকমিশনার এস কে দেল্হভি হাইকমিশনে এসে হাজির। তার হাতে আমাদের স্মারকলিপি হস্তান্তর করে তার সামনেই আমরা সবাই মেঝেতে শুয়ে পড়লাম। পুলিশ এসে পাঁজাকোলা করে আমাদের বের করে দেয়। যে ব্রিটিশ প্রচারমাধ্যম বছরের পর বছর আইয়ুববিরোধী আমাদের আন্দোলন, মিটিং, মিছিল, স্মারকলিপি ইত্যাদির কোনো খবর প্রচার করেনি সেই মিডিয়া এ ঘটনায় আমাদের খবর ছবিসহ ফলাও করে প্রচার করে। প্রতিটি পত্রিকায় ও টেলিভিশনে এটা ছিল lead news । আন্তর্জাতিক সব প্রচারমাধ্যমেও এ খবর গুরুত্বসহকারে প্রচারিত হয়, হয়নি কেবল স্বৈরশাসক আইয়ুব খানের পাকিস্তানে। ১২ বছর পর ১৯৭০ সালে যখন দেশে ফিরে আসি ১২ নভেম্বরে ভয়াবহ ঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে আক্রান্ত উপকূলে ত্রাণ বিতরণের জন্য যাই হাতিয়া ও মনপুরায়। এ ঝড়ে ৫ লাখ লোক মারা যায়। এত বড় ভয়াবহ দুর্যোগের পরও পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার থেকে তেমন কোনো সাহায্য-সহায়তা না আসায় পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের মনে যে বিক্ষোভ জমে তারই বিস্ফোরণ ঘটে জাতীয় সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে ঢালাওভাবে ভোট দিয়ে পাকিস্তানের জাতীয় সংসদে একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। এরপর যখন আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় আসার পথ পাকিস্তানের সামরিক সরকার রুদ্ধ করে দেয় তখনই আমরা স্বাধীন হওয়ার জন্য অস্ত্র ধরি। তাই আমার মনে হয় বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার ব্যাপারে আল্লাহরও হাত ছিল। দুই দিন ধরে প্রায় না খাওয়ার তাড়নায় সন্ধ্যায় হাতিয়ার আর্মি ক্যাম্পে যাই খাওয়ার সন্ধানে। ক্যাম্পের অবাঙালি মেজর ও ক্যাপ্টেন র‌্যাংকের আর্মি অফিসারের সঙ্গে আমার পরিচয় ঘটে লঞ্চে করে হাতিয়ায় যাওয়ার পথে। তাদের কথাবার্তা ও আচরণ ছিল খুবই অমায়িক। তাই তাদের সঙ্গে বেশ সখ্য গড়ে ওঠে। সেই ভরসায় মেজরের ক্যাম্পে গিয়ে অনুরোধ করি খাবারের ব্যবস্থা করার জন্য। তিনি আমাকে বললেন, ‘কিছুক্ষণ অপেক্ষা করেন। আমাদের খাওয়া রান্না হচ্ছে আমাদের সঙ্গে খাবেন।’ তখন সন্ধ্যা ৬টা। নভেম্বর মাস। হালকা ঠান্ডা। বসে থেকে তার সঙ্গে গল্পগুজব করছি এমন সময় ক্যাম্পের পাশের রাস্তা দিয়ে কয়েক শ লোকের মিছিল যাচ্ছিল স্লোগান দিতে দিতে। মেজর আমাকে বললেন, Mr. Chowdhury can you find out what is it all about ? আমি ক্যাম্প থেকে বেরিয়ে মিছিলের লোকদের জিজ্ঞাসাবাদ করতে করতেই মিছিলের সঙ্গে কিছু দূর এগিয়ে যাই। তাদের অভিযোগ ছিল ইউনিয়ন চেয়ারম্যান ত্রাণসামগ্রী তার বাড়িতে মজুদ করে রেখেছেন। আমাদের কোনো ত্রাণ দিচ্ছেন না। আমি মনে করলাম এটা তো একটা ন্যায়সংগত দাবি। তাদের সঙ্গে কথা বলতে বলতে এগিয়ে কখন যে মিছিলের সঙ্গে একাত্ম হয়ে পড়ি জানি না। তাই মিছিলে যোগ দিয়ে চেয়ারম্যানের বাড়িতে তাদের মুখপাত্র হয়ে দাবি-দাওয়ার কথা উত্থাপন করার জন্য গেলে দেখা যায় চেয়ারম্যানের ঘরের দরজা-জানালা তারা ভয়ে বন্ধ করে রেখেছেন। আমি তখন বাইরে থেকে উঁচু গলায় বলি, ‘আপনাদের কোনো ভয় নেই। আমরা আপনাদের কোনো অনিষ্ট করব না। আপনারা দয়া করে ত্রাণসামগ্রী যা মজুদ আছে আমাদের সেগুলো বিলিয়ে দিতে দেন।’ কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা দরজা খুলে ত্রাণসামগ্রী যা-ই রাখা ছিল তা দিয়ে দেয়। ত্রাণসামগ্রী বিতরণ শেষে আমি আর্মি ক্যাম্পের দিকে যাওয়ার পথে দেখি আমাকে কিছু লোক অনুসরণ করছে। আমি সন্দিহান হয়ে জোরে হেঁটে আর্মি ক্যাম্পে সেই মেজরের কাছে না গিয়ে উপস্থিত হই তার অধীন ক্যাপ্টেনের কাছে। মেজরের কাছে যাওয়ার মুখ ছিল না আমার, খবর নিতে গিয়ে আমি উধাও হয়ে যাই বলে। তাকে অনুরোধ করি আমাকে লঞ্চঘাটে পৌঁছে দেওয়ার জন্য। সে দুই জওয়ানকে সঙ্গে করে জিপে চড়ে যখন আমাকে নিয়ে রওনা হয়, তখন বলে, On our way I will stop for a while at the Police Station. I have been reported some people raided Union Chairman’s house and forcibly taken away the relief goods. এ কথা শোনার পর ভাবলাম সে তো মনে হয় আমার ব্যাপারেই থানায় যাচ্ছে। আমি চুপ মেরে থাকলাম। থানায় এসে ক্যাপ্টেন জিপ থেকে নেমে বলল, You wait here for a while. Let me find out about the incident from the Police Station. Then I will drive you to the Launch Terminal. সে যাওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই এক পুলিশ কনস্টেবল এসে আমাকে থানায় যেতে বলে। ভিতরে যেতেই ক্যাপ্টেন বলল, ‘আমার এখানে কিছু করার নেই। পুলিশের অভিযোগ চেয়ারম্যানের বাড়ি ঘেরাও ও লুট করার ব্যাপারে তুমি নাকি দায়ী। তারা তোমাকেই খুঁজছিল।’ এ কথা বলার পর পুলিশ আমাকে থানার হাজতে নিয়ে রাখে। একে নেই খাওয়া, তদুপরি এখন হাজতবাস! কী আছে কপালে কে জানে। ঘণ্টা দেড়েক পরে আমাকে হাজত থেকে বের করে ক্যাপ্টেন আমাকে বলে, ‘আমি এতক্ষণ থানার ওসি এবং একজন ম্যাজিস্ট্রেটের সঙ্গে মিটিং করে সিদ্ধান্ত নিয়েছি To expel you from Hatiya. You are ordered to leave Hatiya by sunrise. This is all that I could do for you. -এই বলে আর্মি অফিসার চলে যায়। তখন ইয়াহিয়া খানের সামরিক শাসন। তাই আর্মি অফিসারের হস্তক্ষেপের কারণে সে যাত্রা থানা থেকে রেহাই পাই। ওসি আমাকে বসিয়ে রেখে বলে, এসব চরাঞ্চল এলাকায় ইউপি চেয়ারম্যানরা খুবই শক্তিশালী। তারা খুন-খারাবি করতে দ্বিধা করে না। আপনি যে এখন লঞ্চঘাটে যাবেন ২ কিলোমিটার হেঁটে, আপনার তো কোনো নিরাপত্তা নেই। চেয়ারম্যানের লোক আপনাকে গায়েব করে দিতে পারে। আমি আপনার সঙ্গে আনসার দিচ্ছি রিকশা করে আপনাকে লঞ্চঘাটে পৌঁছে দেবে। তখন বাজে রাত ১১টা। ঝঞ্ঝাবিধ্বস্ত হাতিয়ায় ওই সময় জনশূন্য অবস্থার কারণে কোনো রিকশাও পাওয়ার উপায় ছিল না। ওসি কনস্টেবলকে পাঠিয়ে এক রিকশাওয়ালাকে বাড়ি থেকে উঠিয়ে আমাকে আনসারসহ রিকশাযোগে নেওয়ার জন্য প্রস্তুতি নেয়। থানার ওসি আমাকে পরামর্শ দিয়ে বলে, রাস্তায় যদি কোনো লোক রিকশা থামায় আপনি নামবেন না। কিছু বলার থাকলে আনসার উত্তর দেবে। আর আনসারকে বলে দেয়, কেউ জিজ্ঞাসা করলে বলবে উনি ওসির একজন রোগী এবং আমাকে বলে, চাদর দিয়ে আপনার দাড়ি ঢেকে রাখবেন। কাকতালীয়ভাবে সেই ওসির বাড়ি ছিল সিলেট। সে আমার বাবাকেও চিনত। ব্রিফিং শেষে রিকশায় চড়ে কিছুদূর যাওয়ার পরই দেখি গুটিকয় লোক লাঠিসোঁটা, টেঁটা নিয়ে টর্চ মেরে হাঁকিয়ে জানতে চায় কে আমি? আমি দুরু দুরু বক্ষে চাদর মুড়ি দিয়ে গুটিসুটি হয়ে রিকশায় বসে থাকলাম। আনসার রিকশা থেকে নেমে গিয়ে ওদের বুঝিয়ে বলার পর আমাদের রিকশা ছেড়ে দেয়।

ঢাকায় ফিরে আসার দুই দিন পরই আমার ডাক পড়ে পূর্ব পাকিস্তান সরকারের স্বরাষ্ট্র সচিব মুজিবুল হকের সঙ্গে সাক্ষাতের। মুজিবুল হক ও আমি একই সময়ে সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের ছাত্র ছিলাম। তার সঙ্গে আমার সুসম্পর্ক ছিল। আমি সচিবালয়ে তার সঙ্গে সাক্ষাতে গেলে তিনি হাসতে হাসতে বললেন, ‘আপনি রিলিফ দিতে গিয়ে এ কি কান্ড করেছেন! হাতিয়ায় চেয়ারম্যানের বাড়ি লুট করেছেন। চেয়ারম্যান আপনার বিরুদ্ধে লুটতরাজের ঘটনা থানায় এফআইআর করেছে। আরও অভিযোগ করেছে আমেরিকান হেলিকপ্টার রিলিফ দিতে গিয়ে হাতিয়ায় অবতরণ করলে যে একদল লোক হেলিকপ্টারটির একটি পাখা ভেঙে ফেলে আপনি এই ঘটনার নেতৃত্বে ছিলেন। দুটো অভিযোগই গুরুতর। যাই হোক আপনি আর এসব ঘটনায় জড়াবেন না। আমি ব্যাপারটা দেখছি।’ চারু মজুমদারের নকশালবাদী আন্দোলন তখন তুঙ্গে। ধারণা দেওয়া হয়েছে এ আন্দোলনের লোকেরাই এটা ঘটিয়েছে। আমি তাদেরই একজন।

লেখক : সরকারের সাবেক উপদেষ্টা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*